নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির বাংলা স্কুলের তৃতীয় শাখার শুভ উদ্বোধন
প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষা ও শিকড়ের সাথে যুক্ত রাখার প্রত্যয়
নিউইয়র্ক থেকে:
যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মাঝে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলা স্কুলের তৃতীয় শাখা চালু করেছে বাংলাদেশ সোসাইটি, ইনক।
গত ২ অক্টোবর জামাইকার ৮৭-৪১ ১৬৫ স্ট্রিটে অবস্থিত অস্থায়ী কার্যালয়ে এক জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই শাখার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর সাবলীল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের সূচনা হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে, যার প্রতি সম্মান জানিয়ে সমবেত সবাই দাঁড়িয়ে ওঠেন। এরপর পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত এবং কোরআনের প্রথম বাণী 'ইকরা' (পড়ো)-এর তাৎপর্য আলোচনার মাধ্যমে মূল পর্বের সূচনা ঘটে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম। এছাড়াও বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যকরী পরিষদের কর্মকর্তাবৃন্দ, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যবৃন্দ, সাবেক নেতৃবৃন্দ, আজীবন ও সাধারণ সদস্য, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক এবং শতাধিক অভিভাবক ও কোমলমতি শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্য ও অতিথিদের কথা :
সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, "বাংলাদেশ সোসাইটির দুটি শাখা—ব্রুকলিন এবং সোসাইটির নিজস্ব কার্যালয়ে—গত ১২ থেকে ১৫ বছর ধরে অত্যন্ত সফলভাবে বাংলা স্কুল পরিচালিত হয়ে আসছে। আজ আমাদের জন্য একটি বিশেষ মুহূর্ত, কারণ আমরা জামাইকায় তৃতীয় শাখা উদ্বোধন করতে যাচ্ছি।" এ সময় তিনি স্কুলের ডাইরেক্টর সৈয়দ উল্লাহসহ ম্যানেজিং বডি এবং শিক্ষকদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
সভাপতির শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলা হয়, "এটি আমাদের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল। আমরা প্রতিটি এলাকায় এক একটি করে বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এরই ধারাবাহিকতায় ব্রঙ্কসের প্রক্রিয়া চলছে এবং আগামীতে ওজন পার্কেও স্কুল করা হবে। এই মহৎ উদ্যোগে আপনাদের সার্বিক সহযোগিতা ও সন্তানদের স্কুলে নিয়ে আসার দায়িত্ব অভিভাবকদেরই নিতে হবে।"
স্কুল ও শিক্ষা সম্পাদক হাসান জিলানী তার বক্তব্যে বলেন, "আজ আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের দিন। প্রবাসের মাটিতে আমাদের সন্তানদের বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করে তোলা আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম আমেরিকায় বেড়ে উঠলেও তারা যেন মাতৃভাষা ও শেকড়কে ভুলে না যায়। বাংলা স্কুল কেবল ভাষা শেখার প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমাদের পরিচয় ও শেকড়ের সাথে এক সেতুবন্ধন।"
ব্রুকলিন শাখার শিক্ষিকা ফারজানা রাখি নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, "আমি তিন সন্তানের মা। আমার তিন সন্তানই বাংলাদেশ সোসাইটির বাংলা স্কুলের ছাত্র ছিল। আমার বড় সন্তান ব্যাচেলর ও মাস্টার্স শেষ করে ওয়াশিংটন ডিসিতে ফেডারেল জব করছে, দ্বিতীয় সন্তান নাসায় কর্মরত এবং ছোট সন্তান কাব্য এবার কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগে পড়তে গেছে।" তিনি জামাইকা স্কুলের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করেন।
জামাইকা শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষিকা রুমানা আফরোজ বলেন, "ইনশাআল্লাহ আমি বাচ্চাদের সাথে থাকবো। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো এবং এই পথচলায় অভিভাবকদের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।"
সোসাইটির নেতৃবৃন্দ জানান, ২০২৪ সালের নির্বাচনে যে এজেন্ডা দেওয়া হয়েছিল, বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা তার মধ্যে অন্যতম। সেই ওয়াদা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই তৃতীয় শাখার আত্মপ্রকাশ। বর্তমান কমিটির মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং এই মেয়াদের মধ্যেই আরও দুটি নতুন স্কুল উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
একটি আবেগঘন মুহূর্ত :
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও আবেগঘন মুহূর্তে শিশুরা হাতে বাংলা বর্ণমালার কার্ড (অ, আ, ক, খ) এবং 'বাংলা স্কুল' লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে মঞ্চের সামনে এসে জড়ো হয়। এ সময় তাদের হাতে বাংলাদেশি ও আমেরিকান পতাকা নিয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়। উপস্থিত অভিভাবকরা পরম মমতায় মোবাইলের ক্যামেরায় সেই দৃশ্য ধারণ করেন।
সবশেষে বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি, স্কুল ও শিক্ষা সম্পাদক হাসান জিলানী, ট্রাস্টি বোর্ড ও কার্যকরী পরিষদের সদস্য এবং শিক্ষকবৃন্দকে সাথে নিয়ে ফিতা কেটে জামাইকায় বাংলা স্কুলের তৃতীয় শাখার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
আয়োজকরা জানান, এই স্কুলটি সপ্তাহে দুই দিন পরিচালিত হবে এবং প্রবাসের নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষার আলোয় আলোকিত করতে অভিভাবকদের প্রতি নিয়মিত সন্তানদের স্কুলে প্রেরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।





