ইসরায়েলগামী বিমানে পাইলটকে ছুরিকাঘাত, যাত্রীদের সহায়তায় রক্ষা পেল ১৭০ জনের বেশি

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানে এক পাইলটকে ছুরিকাঘাতের পর সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করা হয়েছে। যাত্রীদের সহায়তায় বড় বিপর্যয় এড়ানো যায়।

দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিমানে মাঝআকাশে এক পাইলটের ওপর অপর পাইলটের হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিমানটি দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করার পর সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করে। আহত পাইলটকে উদ্ধার ও বিমানের নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেন কয়েকজন যাত্রী এবং ক্রু।

ঘটনার পর ওমানের নাগরিক অভিযুক্ত পাইলটকে সৌদি কর্তৃপক্ষ আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তবে হামলার উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কারণ এখনো তদন্তাধীন।

মাঝআকাশে হঠাৎ বিপজ্জনক পরিস্থিতি

বুধবার ভোর ৩টা ৫ মিনিটে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটটি। বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজটিতে ১৭০ জনের বেশি যাত্রী ও ক্রু ছিলেন।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর সৌদি আরবের আকাশসীমায় বিমানটি অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। প্রায় দুই মিনিটের মধ্যে এটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতা হারায়।

এরপর বিমান থেকে জরুরি সংকেত ‘স্কোয়াক ৭৭০০’ পাঠানো হয়। কিছু সময় পর সংকেত পরিবর্তন করে ‘স্কোয়াক ৭৫০০’ করা হয়, যা সাধারণত বিমানে বেআইনি হস্তক্ষেপ বা ছিনতাইয়ের মতো পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

ককপিটে কী ঘটেছিল

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বর্ণনা অনুযায়ী, এক পাইলট অপর পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে ছুরিকাঘাত করেন। হামলার পর আহত মাচ্ছার ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন বলে দাবি করা হয়েছে।

এ সময় কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু ককপিটে প্রবেশ করে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগের কার্যালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, টালি মানেস নামে এক নারী যাত্রী প্রথম ককপিট থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে অন্যদের সতর্ক করেছিলেন।

এরপর তাঁর স্বামী জভিকা মানেস, ইয়ানিভ হায়ুন, ড. শোতা মুসায়েভ ও আসাফ রাজুয়ানসহ কয়েকজন যাত্রী ককপিটে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আহত পাইলট দরজা খুলে দেওয়ার পর তাঁরা ভেতরে প্রবেশ করেন।

হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনার পর হায়ুন বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন বলে তাঁর নিজের বক্তব্যে জানা গেছে। পরে ফ্লাইদুবাইয়ের অন্য ক্রু সদস্যরা ককপিটে গিয়ে বিমানটিকে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করেন।

যাত্রীদের বর্ণনায় আতঙ্কের মুহূর্ত

বিমানের যাত্রী আলমোগ ইতালি বিবিসিকে জানান, হঠাৎ বিমানটি রোলারকোস্টারের মতো দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করেছিল। কিছুক্ষণ পর যাত্রীদের একটি দল ককপিটের দিকে ছুটে যেতে দেখেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু ককপিটে প্রবেশ করে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর আরেকজন ব্যক্তি বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হন।

আরেক যাত্রী জভিকা মানেস জানান, হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনার পর যাত্রীরা তাঁকে জিপ-টাই ও হেডফোনের তার দিয়ে বেঁধে রাখেন।

সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ

ঘটনার পর বিমানটি কিছু সময়ের জন্য জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করলেও পরে আবার সৌদি আরবের দিকে ফিরে আসে। অবতরণের প্রস্তুতির সময় বিমানটি ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।

পরে স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৫৮ মিনিটে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে।

আহত ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে তাবুকের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সৌদি আরবে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল।

হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে এখনো তদন্ত

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আহত পাইলট ও যাত্রীদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাইলট, যাত্রী ও ক্রুদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে সহায়তা করেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন।

তবে হামলার পেছনে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী ছিল, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ঘটনাটিকে ‘জিহাদি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করলেও তদন্তকারীদের পক্ষ থেকে হামলাকারীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

নেতানিয়াহু বলেছেন, হামলাকারীর কোনো রাষ্ট্রীয় পক্ষ বা সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ ঘটনার কারণ ও সম্ভাব্য পূর্বপরিকল্পনা খতিয়ে দেখছে।

ফ্লাইদুবাই এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও উদ্দেশ্য এখনো জানা যায়নি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অনুমাননির্ভর মন্তব্য না করার আহ্বান জানিয়েছে বিমান সংস্থাটি।

তেল আবিবে ফেরেন যাত্রীরা

জরুরি অবতরণের পর যাত্রীদের জন্য ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৫টা ৪০ মিনিটে তাবুক থেকে বিমানটি ছেড়ে যায় এবং পরে তেল আবিবে পৌঁছে যাত্রীরা গন্তব্যে ফেরেন।

ঘটনার পর ইসরায়েলগামী ও ইসরায়েল থেকে পরিচালিত ফ্লাইদুবাইয়ের সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দেশটিতে ফ্লাইট পরিচালনাকারী পাইলটদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছে।