সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির পর পাকিস্তান কি হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামবে? আঞ্চলিক উত্তেজনা, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ও ইসলামাবাদের অবস্থান বিশ্লেষণ।
সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার হলেও দেশটির হয়ে সরাসরি যুদ্ধে পাকিস্তান অংশ নেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একদিকে রিয়াদের নিরাপত্তার প্রতি অঙ্গীকার, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ও নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাব—সব মিলিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ইসলামাবাদ।
‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণের আলোকে পাকিস্তানের সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে সৌদি আরবের নিরাপত্তায় সহযোগিতা করা আর হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি স্থলযুদ্ধে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়।
দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরোনো। দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা বিষয়ে যোগাযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দুই দেশ কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
এরপর ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। চুক্তিতে তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকারও রয়েছে।
তবে এসব চুক্তির অর্থ এই নয় যে, সৌদি আরবের প্রতিটি সামরিক অভিযানে পাকিস্তানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট সংঘাতে চুক্তির শর্ত কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি ও চুক্তির বিস্তারিত বিধানের ওপর নির্ভর করবে।
হুথি হামলা ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে পাকিস্তানের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বা প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার সঙ্গে সরাসরি শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এক নয়।
রয়টার্সের ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের কর্মকর্তারা আঞ্চলিক সংঘাত প্রশমনের লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনায় হুথি হামলা বন্ধ করা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে সমঝোতার বিষয়ও উঠে আসে। <Cite refs={["turn363243news37"]}/>
এই কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে বোঝা যায়, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি সংঘাত এড়ানো ও উত্তেজনা কমানোর চেষ্টাও চলছে। তবে এ তথ্য দিয়ে পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি
পাকিস্তানের জন্য সরাসরি সামরিক সংঘাতে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত সহজ নয়। দেশটির পশ্চিম সীমান্তে ইরান রয়েছে। হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন কোনো অভিযানে পাকিস্তান সরাসরি অংশ নিলে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংবেদনশীলতা, আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং সামরিক সম্পদের ব্যবহারও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর। ফলে রিয়াদের নিরাপত্তা-উদ্বেগকে উপেক্ষা করাও ইসলামাবাদের জন্য সহজ হবে না। এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই পাকিস্তানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিরক্ষা চুক্তি কি যুদ্ধের নিশ্চয়তা?
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তিন দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সম্মিলিত নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। তবে চুক্তির প্রকাশ্য ঘোষণায় হুথিদের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অভিযানে পাকিস্তানের সরাসরি অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ নেই।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের সংবাদ সম্মেলনে ইয়েমেনের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে দেশটির অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লেও পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে নামবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সংঘাতের বিস্তার, সৌদি আরবের ওপর হামলার ধরন, প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রয়োগ এবং ইসলামাবাদের নিজস্ব নিরাপত্তা-স্বার্থ—এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত দেশটির সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।





