তাহসিফের মৃত্যু: উত্তর খুঁজছে ছয়টি প্রশ্ন

তুরাগ নদ থেকে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর শেষ বার্তা, নিখোঁজ হওয়ার সময় ও মৃত্যুর কারণ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

নিখোঁজ হওয়ার পর ঢাকার তুরাগ নদ থেকে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। পরিবারের দাবি, যে এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে আগে কখনো যাননি তিনি। নিখোঁজ হওয়ার রাতে বাসা থেকে বের হওয়ার পর কী ঘটেছিল, কার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল এবং শেষবার মাকে বার্তা পাঠানোর পর কোথায় ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। তবে ওই ভিডিও ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে এ ঘটনার যোগসূত্র থাকার দাবিও এখন পর্যন্ত প্রমাণিত নয়।

বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দ্বীপ নামে তাঁর এক বন্ধু ও জুনিয়র বাসার নিচ থেকে ডাক দিলে মাকে জানিয়ে বেরিয়ে যান তাহসিফ। সেদিন দিনের বড় একটি অংশ তিনি মায়ের সঙ্গে কাটিয়েছিলেন এবং পরিবারের জন্য কেনাকাটাও করেছিলেন।

হেলাল বলেন, ছেলের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁরা সাড়া পাননি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ মাকে বার্তা পাঠান, ‘আম্মু, আমি আসছি।’ এরপর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার পর থেকে রাতের ওই বার্তা পাওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তাহসিফ কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে ছিলেন এবং কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

মরদেহ উদ্ধারের স্থান নিয়ে প্রশ্ন

তাহসিফের বাবা জানান, ছেলেকে খুঁজতে বুধবার দুপুরে তিনি তুরাগ থানায় গিয়েছিলেন। পরে বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাঁকে ফোন করে নদ থেকে ছেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর জানান।

হেলালের দাবি, রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন যে এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে তাঁর ছেলে কখনো যাননি। ফলে সেখানে তাহসিফ কীভাবে পৌঁছালেন, তা নিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন রয়েছে।

বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধার করেন। উদ্ধারের সময় তাহসিফকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। নৌ পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

অব্যাহতি ও ভিডিওর অভিযোগ নিয়ে কী বলেছিলেন তাহসিফ?

বিমানবাহিনী থেকে তাহসিফের অব্যাহতি এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও নিয়ে পুরোনো অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তাঁর বাবার ভাষ্য, বিমানবাহিনী কর্তৃপক্ষ ছেলের অব্যাহতির কারণ হিসেবে শৃঙ্খলাভঙ্গের কথা জানিয়েছিল। তবে ভিডিও ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে অব্যাহতির কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়ে পরিবারকে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

গত ২১ জুলাই ‘স্পিক উইথ রশিদ’ নামের একটি চ্যানেলে প্রকাশিত পডকাস্টে তাহসিফ নিজের চাকরি ও বিমানবাহিনীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলেন। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিও নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি অভিযোগটির পক্ষে প্রমাণ চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে ৫ আগস্টের আগে-পরে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা নিয়ে সব কথা প্রকাশ করতে পারবেন না বলেও উল্লেখ করেছিলেন।

তাহসিফের বক্তব্য থেকে তাঁর কাছে কিছু অপ্রকাশিত তথ্য ছিল বলে ধারণা তৈরি হতে পারে। তবে সেই তথ্য কী ছিল, তা তিনি প্রকাশ করেননি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ওই তথ্যের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়েও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

হুমকির আশঙ্কা করেছিলেন কি?

ছেলে কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে হেলাল বলেন, তাহসিফ সরাসরি কোনো হুমকির কথা পরিবারকে জানাননি। তবে তিনি কিছুটা আশঙ্কার কথা বলেছিলেন।

হেলালের ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর তাহসিফ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও নেত্র নিউজের পর সর্বশেষ ভার্গো টোব্যাকোতে কর্মরত ছিলেন তিনি।

এদিকে নিজেকে তাহসিফের বন্ধু পরিচয় দেওয়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কে এস এম ইনতিসার ইনজামাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে পুরোনো ভিডিও-সংক্রান্ত ঘটনার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত ধারণা; এর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তদন্তেই মিলতে পারে উত্তর

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখন কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাঁর চলাচলের পথ, শেষবার কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে পাঠানো বার্তার পরিস্থিতি, মরদেহ উদ্ধারের স্থানে পৌঁছানোর কারণ এবং মৃত্যুর প্রকৃত সময় ও কারণ।

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে ময়নাতদন্তের ফল, ফোনের তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং তদন্তের অন্যান্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও নিয়ে পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা প্রমাণ ছাড়া ধরে নেওয়া যাবে না।

তাহসিফের পরিবারের প্রশ্নগুলোর জবাব এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, সেটিই নির্ধারণ করবে তাঁর মৃত্যুর পেছনের ঘটনা সম্পর্কে কতটা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।