ওসমানী বিমানবন্দর থেকে ইউরোপে কৃষিপণ্য পাঠানোর উদ্যোগ

সিলেটের কৃষিপণ্য ইউরোপে রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে ওসমানী বিমানবন্দর-সংলগ্ন এলাকায় প্যাকেজিং হাউস ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রায় দুই দশক পর রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা
সিলেট থেকে ইউরোপের বাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানি আবারও চালুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ লক্ষ্যে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-সংলগ্ন এলাকায় প্যাকেজিং হাউস ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। চলতি বছর প্রকল্পের কাজ শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন পর সিলেট থেকে সরাসরি ইউরোপের বাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানির পথ সুগম হতে পারে। এতে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন বাজার তৈরির পাশাপাশি কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যেভাবে থেমে যায় রপ্তানি

একসময় সিলেটে উৎপাদিত লেবুজাতীয় ফল ও বিভিন্ন ধরনের সবজি বাংলাদেশ বিমানের সরাসরি ফ্লাইটে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হতো। লন্ডন, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, লুটন, ওল্ডহ্যাম, নিউহ্যাম, ব্র্যাডফোর্ড, রচডেল, নিউক্যাসল ও কার্ডিফের মতো শহরের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকার সুপারশপগুলোতে এসব পণ্যের চাহিদা ছিল উল্লেখযোগ্য।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রপ্তানিকৃত লেবুজাতীয় ফলে ‘সাইট্রাস ক্যানকার’ রোগের জীবাণু শনাক্ত হওয়া এবং সিলেট থেকে সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। ২০০৭ সাল থেকে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলোতে সিলেটের কৃষিপণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর সিলেটের পণ্য ঢাকার শ্যামপুরের প্যাকিং হাউসে নিয়ে মান যাচাই ও প্যাকেজিং করে রপ্তানির ব্যবস্থা করতে হতো। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে রপ্তানিতে আগ্রহ হারান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

কার্গো কমপ্লেক্স থাকলেও ছিল সীমাবদ্ধতা

সিলেটের কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কার্গো কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। তবে প্রয়োজনীয় প্যাকেজিং হাউস ও কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় অবকাঠামোটি ব্যবহার করে কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্যাকেজিং হাউস নির্মাণের উদ্যোগে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়কে আধাসরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন। প্রস্তাবিত স্থাপনার জন্য ওসমানী বিমানবন্দর-সংলগ্ন বাইশটিলা এলাকায় জায়গাও নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রপ্তানি হতে পারে সিলেটের নানা ধরনের কৃষিপণ্য

প্যাকেজিং হাউস ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মিত হলে সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন ফল ও সবজি বিদেশে পাঠানোর সুযোগ বাড়বে। সম্ভাব্য পণ্যের তালিকায় রয়েছে গোয়ালগাদ্দা শিম, নাগা মরিচ, খাসিয়া পান, তইকর, ডেফল, ফরাশ, শিমের বিচি, ঢাকাদক্ষিণের লালমাটিতে উৎপাদিত কচুমুখী ও লতি, জারা লেবু, আদা লেবু, সাতকরা, কমলা, মাল্টা, আনারস, তরমুজ ও লুকলুকি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও ব্যবসায়ীদের মতে, এসব পণ্যের ইউরোপের বাজারে চাহিদা রয়েছে। যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সিলেটের কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

কৃষকের আয় বাড়ার প্রত্যাশা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক মো. শামসুজ্জামান বলেন, উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম পাবেন। এতে কৃষিপণ্য উৎপাদনে তাঁদের আগ্রহও বাড়বে।

ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমদ জানান, প্যাকিং হাউস ছাড়া বিমানবন্দর দিয়ে কৃষিপণ্য রপ্তানির প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা রয়েছে। প্যাকিং হাউস স্থাপন করা গেলে সিলেট থেকে বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেটের কৃষিপণ্যের জন্য ইউরোপের বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পণ্যের গুণগত মান, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও রপ্তানি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।