বনরুটির দাম বাড়ল ৫ টাকা, শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট বেড়েছে

রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বনরুটি, পাউরুটি ও কেকের দাম বেড়েছে। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম সমন্বয়ের কথা জানিয়েছে বেকারি মালিকদের সংগঠন।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে বেকারির তৈরি বনরুটি, পাউরুটি ও কেকের দাম। কোনো কোনো এলাকায় পণ্যের দাম না বাড়লেও কমানো হয়েছে আকার ও ওজন। এতে বাড়তি চাপে পড়েছেন নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকার রিকশাচালক মো. আলমগীর প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা রিকশা চালান। কাজের ফাঁকে দিনে তিন-চারবার হালকা নাশতা করেন তিনি। প্রতিবার একটি বনরুটি ও এক কাপ দুধ চা খাওয়া তাঁর নিয়মিত অভ্যাস।

এত দিন প্রতি নাশতায় তাঁর খরচ হতো ২০ টাকা—বনরুটি ১০ টাকা এবং দুধ চা ১০ টাকা। কিন্তু গত রোববার থেকে বনরুটির দাম বেড়ে যাওয়ায় একই নাশতায় এখন খরচ হচ্ছে ২৫ টাকা।

আলমগীর বলেন, ‘দুইডা খেপ (ভাড়া) মাইরা একটা রুটি, একটা চা খাওনই লাগে। না হয় শরীরে বল পাই না। কিন্তু এহন খরচ ৫ টেয়া বাড়ছে।’

২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম সমন্বয়

বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি জানিয়েছে, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় গত শনিবার থেকে রুটি, বিস্কুটসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্যের দাম ও ওজন সমন্বয় করা হয়েছে। সব মিলিয়ে কোনো কোনো পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, হাতে তৈরি বেকারি বিস্কুটের দাম কেজিতে গড়ে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আগে সাধারণ মানের যেসব বিস্কুট ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, সেগুলোর দাম এখন ১৫০ টাকা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, বনরুটি ও মাফিন কেকের ক্ষেত্রে কোথাও দাম বাড়ানোর পাশাপাশি ওজন কমানো হয়েছে। আগে ৪০ গ্রাম ওজনের কিছু বনরুটি ও মাফিন কেক একই দামে ৩৫ গ্রামে বিক্রি করা হচ্ছে। আবার ১০ বা ১২ টাকা দামের কোনো কোনো বনরুটি ১৫ টাকা করা হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে আকার সামান্য বড় করার কথাও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ঢাকায় বাড়তি দামে বিক্রি

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, মগবাজার ও খিলগাঁও এলাকায় খোঁজ নিয়ে খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে বনরুটি ও কেক বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।

এর আগে দাম সমন্বয়ের দাবিতে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার রাজধানীর বেকারি কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছিল। দুই দিন বন্ধ থাকার পর শনিবার সকাল থেকে নতুন নির্ধারিত মূল্যে বাজারে বেকারি পণ্য সরবরাহ শুরু করেন ব্যবসায়ীরা।

তবে ঢাকার বাইরে সব এলাকায় এখনো দাম বাড়েনি। খুলনা, চট্টগ্রাম, সাভার ও রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় রোববার পর্যন্ত আগের দামেই বনরুটি ও কেক বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।

কাঁচামালের দাম বাড়ায় চাপে বেকারি ব্যবসা

বেকারি মালিকেরা জানিয়েছেন, গত দেড় থেকে দুই বছরে ময়দা, চিনি, ডালডা, সয়াবিন তেল ও গ্যাসসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচও বেড়েছে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাস আগের তুলনায় খুচরা বাজারে খোলা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ, খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৫ শতাংশ এবং চিনির দাম গড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ক্ষুদ্র বেকারির সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ৭০০টির বেশি বেকারি।

ব্যবসায়ী মো. জালাল উদ্দিন বলেন, গত এক বছরে বিভিন্ন কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বাড়ায় বেকারি পণ্য উৎপাদনের খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে উৎপাদন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমেছে। ফলে ছোট ও মাঝারি বেকারি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের চাপে রয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘রুটি ও কেক তৈরির কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে খরচ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়েই আমরা এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

বাড়তি খরচের প্রভাব পড়ছে চায়ের দোকানেও

মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব সড়কের চা বিক্রেতা জব্বার শেখ বলেন, গত এক মাসে চা পাতার দাম কেজিতে ৫০ টাকা বেড়েছে। চিনির দামও কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। এখন রুটি ও কেকের দাম বাড়ায় তাঁর বেচাকেনায়ও প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি বলেন, চায়ের দাম বাড়ানো সম্ভব না হওয়ায় রুটি-কেকের দাম বৃদ্ধির কারণে ক্রেতাদের অনেকে নাশতা কমিয়ে দিতে পারেন।

এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি বেকারি পণ্যের দাম বাড়ায় সীমিত আয়ের মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় আরও বাড়ছে।