সাজেকে অবরোধের কারণে আটকে পড়া ২,৯৩৩ পর্যটক নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি ফিরেছেন। শহরে হোটেলের কক্ষ না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেকে।
রাঙামাটির সাজেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের মধ্যে আটকে পড়া ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটক নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি শহরে ফিরেছেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বেলা একটার দিকে তাঁদের বহর খাগড়াছড়িতে পৌঁছায়। তবে ফিরে এসে হোটেলে কক্ষ না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেক পর্যটক। ফেরার পথে অবরোধকারীদের বাধা ও গোলাগুলির ঘটনায় আতঙ্কের মধ্যেও সময় কাটাতে হয়েছে তাঁদের।
খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বরে ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আব্দুল মালেক জানান, পরিবারের আট সদস্যকে নিয়ে বুধবার দুপুরে সাজেকে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। শুক্রবার ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও অবরোধের কারণে আগেই ফিরতে হয়েছে।
আব্দুল মালেক বলেন, সন্ধ্যায় একটি সংগঠনের সড়ক অবরোধের খবর পান তাঁরা। বৃহস্পতিবার ফেরার পথে অবরোধকারীরা গাড়ি আটকে দেন। আতঙ্কের মধ্যে থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছেছেন। এখন দ্রুত বাড়ি ফিরতে পারলেই স্বস্তি পাবেন।
সাজেকের সাম্পারি গেস্টহাউসের কর্মচারী জুগেশ্বর ত্রিপুরা বলেন, সাজেক বন্ধ ঘোষণার পর তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। উজো বাজার এলাকায় পৌঁছে দেখেন, গাড়িগুলো আটকে রাখা হয়েছে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের গাড়িগুলো নিরাপদে নিয়ে আসেন।
খাগড়াছড়িতে হোটেল না পেয়ে বিপাকে পর্যটকেরা
সাজেক থেকে ফিরলেও অনেক পর্যটক খাগড়াছড়ি শহরে আবাসন সংকটে পড়েছেন। আগে থেকে বুকিং না থাকায় কিংবা হোটেলের কক্ষ খালি না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কেউ কেউ।
পর্যটক মিজানুর রহমান বলেন, তাঁদের পরিবারের শুক্রবার পর্যন্ত সাজেকে থাকার পরিকল্পনা ছিল। সে অনুযায়ী শুক্রবার রাতে ঢাকায় ফেরার টিকিটও কাটা হয়েছিল। কিন্তু খাগড়াছড়িতে এসে দুটি ভালো হোটেলে কক্ষ না পেয়ে পরিবার নিয়ে কী করবেন, তা বুঝতে পারছেন না।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, সব পর্যটক নিরাপদে খাগড়াছড়িতে ফিরেছেন। তাঁদের কেউ কেউ শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, আবার অনেকে এখনো সেখানে অবস্থান করছেন।
উজো বাজারে আটকে পড়ে গাড়িবহর
প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে প্রায় ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটক রওনা হন। সকাল নয়টার দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। কিন্তু অবরোধের কারণে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বাঘাইছড়ির উজো বাজার এলাকায় গাড়িগুলো আটকে পড়ে।
অবরোধকারীরা সড়কে অবস্থান নেওয়ায় পর্যটকদের গাড়ি এগোতে পারছিল না। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা লাঠিপেটা করলে অবরোধকারীরা সরে যান। এরপর বেলা ১১টার দিকে গাড়িবহর উজো বাজার এলাকা ছাড়ে।
এর কিছুক্ষণ পর, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলি শুরু হয় বলে জানায় পুলিশ। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
অনির্দিষ্টকালের অবরোধ, সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ
সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেয় সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। বুধবার দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠন দুটি বৃহস্পতিবার থেকে অবরোধ শুরুর কথা জানায়। একই সঙ্গে বুধবারের মধ্যে পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়।
অবরোধের পর নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। বুধবার সন্ধ্যায় জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি বন্ধ রাখার কথা জানান। বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার মধ্যে পর্যটকদের নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকালে সাজেক ছাড়তে শুরু করেন পর্যটকেরা। তবে যাত্রা শুরুর প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই উজো বাজার এলাকায় অবরোধের মুখে পড়েন তাঁরা।
অবরোধকারীদের দাবি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
এর আগে ১৫ অক্টোবর সকাল ছয়টা থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে দ্বিতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করে সংগঠন দুটি। সে সময় সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার ও গাছের গুঁড়িতে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন তাঁদের নেতা-কর্মীরা। এর আগেও একই দাবিতে ১১ অক্টোবর অবরোধের ডাক দেওয়া হয়েছিল।
অবরোধকারীদের তিন দফা দাবির একটি হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস—সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে জেএসএস। সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই এ ধরনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
পর্যটন ব্যবসা ও স্থানীয়দের জীবিকায় প্রভাব
অবরোধ এবং পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের ঘোষণায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীরা। সাজেক রিসোর্ট কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, অবরোধের কারণে পর্যটকদের সাজেক ছাড়তে হচ্ছে। অনেকে রিসোর্টের আগাম বুকিংও বাতিল করেছেন।
তিনি আরও বলেন, সড়ক অবরোধের প্রভাব শুধু পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় বাসিন্দারাও ভোগান্তিতে পড়েন। খাদ্যসামগ্রী কেনাকাটা এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়ার কাজ ব্যাহত হয়।





