আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেললেন লিওনেল মেসি। শৈশব থেকে বিশ্বকাপ জয়—জাতীয় দলের হয়ে তাঁর দুই দশকের বেশি পথচলার আবেগঘন গল্প।
মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন কানায় কানায় পূর্ণ। হাজার হাজার কণ্ঠে একসঙ্গে ধ্বনি উঠছে—‘মেসি... মেসি... মেসি...’। কেউ পতাকা হাতে, কেউ চোখের পানি মুছছেন, কেউ আবার প্রিয় তারকার নাম ধরে কাঁদছেন।
কারণ সবাই জানতেন, আর কখনো হয়তো এই মানুষটিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মাঠে দেখা যাবে না।
লিওনেল মেসির জন্যও রাতটি ছিল অন্যরকম। দুই দশকের বেশি সময় ধরে যে জার্সিকে নিজের দ্বিতীয় পরিচয় বানিয়েছেন, সেই জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নেমেছিলেন তিনি। তাই বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিল না; এটি ছিল একটি যুগের সমাপ্তির রাত।
মাঠে নামার আগেই চোখে পানি
স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর আগেই মেসির চোখে ছিল বিদায়ের আবেগ। দলের বাসে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। হয়তো একে একে ফিরে আসছিল জাতীয় দলের সঙ্গে কাটানো দীর্ঘ জীবনের স্মৃতিগুলো।
শৈশবের রোজারিও, প্রথমবার জাতীয় দলের জার্সি, অসংখ্য জয়-পরাজয়, ফাইনালে হারের হতাশা, সমালোচনা—সবকিছু পেরিয়ে আজকের এই জায়গায় পৌঁছেছেন তিনি।
মনুমেন্তালে পৌঁছানোর পর আবেগ আরও বেড়ে যায়। ড্রেসিংরুমে ছিল তাঁকে ঘিরে বিশেষ আয়োজন। স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও তিন ছেলে ভিআইপি বক্সে পৌঁছেছেন কি না, সেটিও আগে নিশ্চিত করে নেন মেসি।
ওয়ার্মআপে মাঠে পা রাখতেই পুরো গ্যালারি দাঁড়িয়ে যায়। চারদিকে শুধু মেসির নাম। জবাবে তিনি হাত নাড়েন। কিন্তু চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারেননি।
জাতীয় সংগীতেও গলা মেলাতে পারেননি
মাঠে প্রবেশের সময় তিন ছেলেকে পাশে নিয়ে আকাশের দিকে তাকান মেসি। এরপর শুরু হয় জাতীয় সংগীত।
কিন্তু এবার তিনি গাইতে পারেননি।
গলায় যেন আটকে ছিল কয়েক দশকের স্মৃতি।
হয়তো মনে পড়ছিল দাদি সেলিয়ার কথা। ছোট্ট লিওকে যিনি মাঠে নিয়ে যেতেন। ফুটবলের প্রতি নাতির অসীম আগ্রহ দেখে তিনি বুঝেছিলেন, এই ছেলের মধ্যে অন্যরকম কিছু আছে।
সেই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলারদের একজন হয়েছেন। আর তাঁর ফুটবলজীবনের শেষ অধ্যায়ও লেখা হলো সেই জাতীয় দলের জার্সিতেই।
বিদায়েও গোল, অ্যাসিস্ট—সবই মেসির মতো
বিদায়ী ম্যাচ বলে মেসি অবশ্য খেলাটা ভুলে যাননি। শুরুতে আর্জেন্টিনা কিংবা মেসি নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে ছিলেন না। বেনিনের খেলোয়াড়েরা একাধিকবার মেসির কাছে গিয়ে তাঁকে সম্মান জানান।
কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে যেন বদলে গেল দৃশ্য।
প্রথমে নিকোলাস ওতামেন্দির গোলে সহায়তা করেন মেসি। আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় ১-০ গোলে।
এরপর নিকো পাজকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন নিজের পরিচিত নিখুঁত স্পর্শে। ব্যবধান দাঁড়ায় ২-০।
শেষটাও রেখে দিয়েছিলেন নিজের জন্য। পেনাল্টি থেকে গোল করে জাতীয় দলের হয়ে নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে যান ১২৬-এ।
সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। কেউ আলিঙ্গন করেন, কেউ মাথায় হাত রাখেন। মেসি তখন হাসছেন। যেন বিদায়ের মুহূর্তটাও তিনি সতীর্থদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইছেন।
যে ছেলেটি শুধু ফুটবল খেলতে চেয়েছিল
মেসির শৈশবের স্বপ্ন ছিল খুব সাধারণ। তিনি ফুটবল খেলতে চেয়েছিলেন।
রোজারিওর মাঠে বল নিয়ে ছুটে বেড়ানো সেই শিশুটি একসময় নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখতেন। একই সঙ্গে ছিল আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে খেলার আকাঙ্ক্ষা।
কিন্তু ছোট বয়সেই তাঁর শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে। চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। পরিবারকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এরপর আসে বার্সেলোনার সুযোগ। মাত্র ১৩ বছর বয়সে স্পেনে পাড়ি দেন মেসি।
নিজের পরিচিত শহর, বন্ধু ও শৈশবের পরিবেশ ছেড়ে নতুন দেশে যাত্রা ছিল সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু সামনে ছিল একটি বড় স্বপ্ন—একদিন আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা।
সমালোচনার পাহাড় পেরিয়েছেন
মেসির জাতীয় দলের গল্প শুধু ট্রফি আর রেকর্ডের গল্প নয়। এর মধ্যে আছে অসংখ্য হতাশাও।
একাধিক ফাইনালে হারের পর তাঁকে শুনতে হয়েছে তীব্র সমালোচনা। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর একপর্যায়ে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।
অনেকে তখন ভেবেছিলেন, মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ এখানেই।
কিন্তু তিনি ফিরে এসেছিলেন।
আর সেই প্রত্যাবর্তনের পর যেন বদলে যেতে থাকে গল্পের প্রতিটি পৃষ্ঠা।
শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হলো স্বপ্ন
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি পান মেসি।
এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তুললেন তিনি। যে ট্রফির জন্য তাঁর ক্যারিয়ারের একটি বড় অংশ অপেক্ষা করেছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে উঠল।
এরপর আরও একটি কোপা আমেরিকা। বয়স বাড়লেও থামেননি। ২০২৬ বিশ্বকাপেও দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
একসময় যে গল্পটিকে অসম্পূর্ণ মনে হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে ফুটবলের অন্যতম পূর্ণাঙ্গ কাহিনি।
মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো ট্রফি নয়
মেসিকে নিয়ে ভবিষ্যতে অসংখ্য পরিসংখ্যান লেখা হবে।
কত গোল, কত অ্যাসিস্ট, কত ট্রফি, কত রেকর্ড—সবই থাকবে।
কিন্তু মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো এসব সংখ্যার বাইরে।
ব্যর্থতার পরও ফিরে আসা, সমালোচনার মধ্যেও নিজের কাজ করে যাওয়া এবং ২১ বছরের বেশি সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের মান ধরে রাখা—এই ধারাবাহিকতাই তাঁকে আলাদা করেছে।
জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচেও সেটিই দেখা গেল। বিদায় নিতে এসেও তিনি খেললেন জয়ের জন্য। সতীর্থদের গোল করালেন, নিজে গোল করলেন, শেষ বাঁশি পর্যন্ত মাঠে থাকলেন।
একজন মেসি চলে গেলেন, অনেক মেসি থেকে গেলেন
মেসির তিন ছেলে—থিয়াগো, মাতেও ও সিরো—এখন ফুটবল নিয়ে ছুটে বেড়ায়। তাদের দৌড়ের মধ্যে কখনো কখনো যেন দেখা যায় ছোট্ট লিওর ছায়া।
এক প্রজন্মের স্বপ্ন ছিল মেসিকে দেখে বড় হওয়া। আরেক প্রজন্মের স্বপ্ন এখন তাঁকে অনুসরণ করা।
নিকো পাজ কিংবা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোর মতো তরুণদের কাছে মেসি শুধু একজন কিংবদন্তি নন, তিনি ফুটবলের জীবন্ত পাঠ।
কখনো তাঁকে দূর থেকে দেখা তরুণরা আজ তাঁর সতীর্থ হয়েছে। কেউ তাঁর কাছ থেকে শিখেছে, কেউ তাঁকে অনুসরণ করে জাতীয় দলের জার্সি পরেছে।
এটাই হয়তো মেসির সবচেয়ে বড় জয়।
বিদায় শুধু জার্সির, মেসির নয়
মনুমেন্তালে শেষ বাঁশি বাজার পর একটি যুগের সমাপ্তি ঘটেছে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির পথচলা থেমে গেছে।
কিন্তু মেসির গল্প থামেনি।
যে শিশু একদিন বল নিয়ে রোজারিওর মাঠে ছুটেছিল, সে আজ কোটি মানুষের স্মৃতির অংশ। যে তরুণ ব্যর্থতার ভারে জাতীয় দল ছাড়তে চেয়েছিলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ হাতে বিদায় নিয়েছেন।
তাই মেসির বিদায় আসলে শেষ নয়।
আর্জেন্টিনার জার্সি থেকে মেসি বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু ফুটবল থেকে, মানুষের স্মৃতি থেকে, আর একটি প্রজন্মের হৃদয় থেকে—মেসি কখনো বিদায় নেবেন না।





