ক্রেতা সংকটে বন্ধ কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, বিক্রির উদ্যোগ

ক্রেতাসংকট, উড়ালসড়ক নির্মাণের প্রভাব ও করোনার ধাক্কায় বন্ধ হয়েছে রাজধানীর কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স। চলছে জায়গা বিক্রির আলোচনা।

রাজধানীর কাকরাইলের একসময়ের অভিজাত বিপণিবিতান কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্রেতা কমে যাওয়া, উড়ালসড়ক নির্মাণের সময় ব্যবসায়িক মন্দা, করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব এবং কিছু দোকানে নিম্নমানের প্রসাধনী বিক্রির অভিযোগে সুনামহানির কারণে বিপণিবিতানটি ক্রমেই ব্যবসা হারায়। শেষ পর্যন্ত দোকানমালিকেরা এটি বন্ধ করে মালিকানা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

গত ১ অক্টোবর থেকে বিপণিবিতানটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সোমবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে মূল ফটকে শাটার বন্ধ এবং ‘১ অক্টোবর হতে শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ থাকিবে’ লেখা একটি ব্যানার দেখা যায়। তবে বিপণিবিতানের বাইরের অংশে কয়েকটি দোকান ও একটি এটিএম বুথ চালু রয়েছে।

১৯৯৮ সালে যাত্রা, ছিল ১৯৮টি দোকান

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স ১৯৯৮ সালে চালু হয়। ২০ তলা ভবনের বেজমেন্ট ও চারটি তলা নিয়ে গড়ে ওঠা বিপণিবিতানটিতে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, গয়না ও টেইলারিংসহ বিভিন্ন ধরনের দোকান ছিল। ভবনের অন্য তলাগুলোতে ছিল আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট।

কর্ণফুলী গ্রুপের নির্মিত এই বিপণিবিতানে ১৯৮টি দোকানের মালিকানা কিনেছিলেন ১২৫ জন ব্যবসায়ী। একসময় মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয় থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দোকানগুলোতে ক্রেতার আনাগোনা কমতে থাকে।

দোকানমালিক সমবায় সমিতির নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হওয়ার আগে বিপণিবিতানটিতে মাত্র ২৫টি দোকান চালু ছিল। ক্রেতাসংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত দোকানমালিকেরা সম্মিলিতভাবে বিপণিবিতান বন্ধ এবং মালিকানা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন।

উড়ালসড়ক নির্মাণে কমে ক্রেতা

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকীবিল্লাহ ওসমানী জানান, এক দশকের বেশি সময় ধরে বিপণিবিতানটির বেচাকেনা কমছিল। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, মগবাজার-মালিবাগ উড়ালসড়ক নির্মাণের সময় তীব্র যানজটের কারণে বিপণিবিতানে ক্রেতাদের যাতায়াত কমে যায়। তখন কয়েকজন দোকানমালিক আশপাশের অন্য বিপণিবিতানে সাময়িকভাবে ব্যবসা সরিয়ে নেন। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও তাঁদের অনেকে আর ফিরে আসেননি।

করোনার ধাক্কা, সুনাম নিয়েও প্রশ্ন

উড়ালসড়ক নির্মাণের পর ব্যবসা পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব পড়ে। সমিতির নেতাদের দাবি, ওই সময় শতাধিক দোকান বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেগুলোর অধিকাংশই আর চালু হয়নি।

এ ছাড়া বিপণিবিতানের কিছু প্রসাধনীর দোকানে নিম্নমানের পণ্য বিক্রির অভিযোগ ওঠে। সমিতির নেতাদের মতে, এসব অভিযোগের কারণে বিপণিবিতানটির সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্রেতা কমতে থাকায় দোকান চালিয়ে যাওয়াও ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

জায়গা বিক্রিতে হাসপাতাল, ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা

বিপণিবিতানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করছেন দোকানমালিকেরা। বাকীবিল্লাহ ওসমানী জানান, জায়গাটি বিক্রির বিষয়ে হাসপাতাল, ব্যাংক ও বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে বলে আশা করছেন তাঁরা।

এদিকে বিপণিবিতানের বাইরে থাকা কিছু দোকান এখনো চালু রয়েছে। রেমন্ডের বিক্রয়কেন্দ্রের কর্মকর্তা মো. মামুন জানান, তাঁদের দোকানের মালিক এখনো সরে যাওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেননি। নির্দেশনা পেলে তাঁদেরও চলে যেতে হবে।

পাশের জ্ঞান বিচিত্রা কফিশপের মালিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিপণিবিতান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁদের ব্যবসাও কমে গেছে। আগামী মাসে দোকান ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। অন্যদিকে সুমি’স হটকেকের ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান জানান, দোকান ছাড়ার বিষয়ে মালিকের কাছ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাননি তাঁরা।

একসময় ক্রেতাদের আনাগোনায় মুখর থাকা কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির এই পরিণতি রাজধানীর পুরোনো বিপণিবিতানগুলোর ব্যবসায়িক সংকটের একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।